প্রতিবছর যখন ১৪ই ফেব্রুয়ারি আসে, বসন্তের আগমনী দিনে, আর তখনই এই বিশেষ দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ভালোবাসার অর্থ, গভীরতা, এবং এর তীব্র অনুভূতির কথা। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, পহেলা ফাগুন—এই দুটি দিনে একটি নির্দিষ্ট রঙের ঔজ্জ্বল্য থাকে, যা আমাদের অন্তরে এক গভীর উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে। বসন্তের হাওয়া, ফুলের মধুর গন্ধ, আর ভালোবাসার উজ্জ্বলতর বর্ণ—সব কিছু একত্রে মিলে জীবনের প্রতি এক অপার ভালোবাসার চেতনা জন্ম দেয়।
আমি একেকবার ভালোবাসা সম্পর্কে লিখে থাকি, অনুভূতির গভীরে প্রবাহিত হতে থাকি, কিন্তু মনে হয় কোনো না কোনো জায়গায় যেন কিছু অমীমাংসিত থেকে যায়। গতকাল থেকে কিছু লেখা লিখে রেখেছিলাম, কিন্তু কিছুই যেন পূর্ণতা পেল না। ভালোবাসার শব্দগুলো যেন কল্পনায় খোঁজ করছিলো, কোথাও, কাউকে, যে এই দিনটির বিশেষ আলোয় সমগ্র পৃথিবীকে এক নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শেখায়। যখন চিন্তা করলাম, এই ভালোবাসার দিনটিতে আমার সৃষ্টির পূর্ণতা কোথায় পাবো—তখন আমার মনে ঘুরপাক খেতে লাগলো। কোনোকিছুর মাধ্যমে এই ভালোবাসা প্রকাশ করতে চাই—কিন্তু কে হবে সেই মানুষটি, যে ভালোবাসা জানানো উচিত, যার প্রতি আমার অন্তরের আকুল অনুভূতি?
এবার আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই বছরের ভালোবাসার স্রোত একান্তভাবে আমার প্রিয় মানুষ, সেই ব্যক্তি—যিনি কেবল একজন কবি, সাহিত্যিক, সমাজ চিন্তক বা গণমাধ্যম কর্মী নন, বরং এক বহুগুণের মানুষ—অবিশ্বাস্য প্রতিভার অধিকারী, আর যার প্রতি আমার শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা অপরিসীম। সেই ব্যক্তি হলেন আসিফ ইকবাল। তার প্রতিভা, তার চিন্তাভাবনা, তার মানবিকতা, তার সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা—এই সব কিছুই তাকে এমন এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে, যার গল্প ছোট পরিসরে বলা সম্ভব নয়। তবে, আজ আমি চেষ্টা করবো তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানাতে, যাতে অন্তত কিছুটা হলেও সেই অবর্ণনীয় অনুভূতি বর্ণনায় প্রকাশিত হতে পারে। তবে, আশিফকে নিয়ে লিখতে বসলে মনে হয়, তার কথা এতটুকু শব্দে, সাধারণ বাক্যে, সহজ রঙে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। তিনি এমন এক চরিত্র, যার প্রতিটি পদক্ষেপই যেন আমাদের সামনে একটি নতুন জীবনের দরজা খুলে দেয়। সাহিত্য, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম—সব জায়গাতেই তার বিচরণ, তার প্রভাব ও উপস্থিতি এত গভীর, যে তাকে নিয়ে কোনো কথাই যেন শেষ হয় না। কিন্তু তার প্রতি ভালোবাসার এই ছোট্ট বহিঃপ্রকাশেই আমি যেন খুঁজে পেতে চাই, একজন মেধাবী, সৃজনশীল, দয়ালু এবং সচেতন মানুষের প্রতি আমার হৃদয়ের শ্রদ্ধা। অতএব, এই লেখার শুরুতেই, ভালোবাসার দিনটিতে, আমি লিখতে বসেছি—এই বছরের ভালোবাসার উপলক্ষ্যে, আমার প্রিয়, শ্রদ্ধেয়, এবং ভালোবাসার মানুষ আসিফ ইকবাল-এর প্রতি আমার অন্তরের প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর উদ্দেশ্যে।
জীবন যখন স্রোতময়, তখন কিছু মানুষ থাকে যারা নিজেদের অবিচল কর্মজীবন ও নীতি-আদর্শের মাধ্যমে সময়ের নদীতে এক অমলিন রেখা রেখে যায়। তাদের মধ্যে একজন হলেন আসিফ ইকবাল, যিনি সংবাদমাধ্যম ও সংস্কৃতির মঞ্চে এক নিবেদিত প্রাণ হিসেবে পরিচিত। এ অমূল্য রত্নের খোঁজ সবার জন্য সহজে পাওয়া যায় না, কিন্তু তার সাথে সম্পর্কিত থাকলে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ যেন জীবনের এক নতুন পথকে স্পষ্ট করে তোলে। তাকে যারা জানেন, তাদের কাছে তিনি শুধু একজন সাংবাদিক কিংবা সংস্কৃতি কর্মী নন; তিনি একজন আধ্যাত্মিক পথিক, যিনি তার জীবনযাত্রা, চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতির প্রতি তার গভীর ভালোবাসা দিয়ে আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করেন। বিগত দুই যুগ আগে তার সাথে পরিচয়ের মুহূর্তটি ছিলো এক অদ্ভুত দ্যুতি। তখন থেকেই আমি জানি, আশিফের ভেতরে এক বিশেষ শক্তি রয়েছে, এক অমিত সম্ভাবনা, যা সময়ের সাথে আরো নিখুঁত হয়ে ওঠে। তার জীবনযাত্রা, চলাফেরা, কর্মবিধি এবং মানসিকতা সবই যেন এক স্বাধীন, সাহসী এবং চিন্তাশীল পথচলার চিত্র তুলে ধরে। যে মানুষটি তার জীবনকে এক অবিচল মিশন হিসেবে গ্রহণ করে, তার পেছনে থাকা সংগ্রাম, ভালোবাসা এবং একাগ্রতা সবার কাছেই এক অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। আশিফের মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ আগুন ছিলো, যা কখনো নিভে না, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে জ্বলতে থাকে।
তার জীবন সঙ্গী হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাহাব উদ্দিন মেয়ে, যিনি ছিলেন একজন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। সাহাব উদ্দিন ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন মহিমান্বিত যোদ্ধা, যিনি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে দেশপ্রেম এবং সাহসিকতার অমর ছবি আঁকেন। তিনি যখন আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নেন, তখন আশিফ তার মৃত্যুর স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে শবেবরাতের রাতে তার সাহসিকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কথা সবসময় মনে রাখতেন। এই সবকিছুই আসিফের অন্তরে এক গভীর স্মৃতির সৃষ্টি করে, যা তার জীবনকে আরও শক্তিশালী এবং অর্থবহ করে তোলে।
আসিফ ইকবাল নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন যখন তিনি সাহাব উদ্দিন সাহেবের কন্যাকে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। একদিকে যেখানে এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আশিফ তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা লাভ করেছিলেন, অন্যদিকে তার জীবন সঙ্গীও ছিলেন একজন সংস্কৃতি ও স্বাধীনচেতা নারী। তার সঙ্গে এক মনের মতো একসাথে জীবন যাপন শুরু করা ছিলো যেন দুটি চিন্তা, দুটি দৃষ্টিভঙ্গি এবং দুটি মুক্তচিন্তার মিশ্রণ। তাদের সম্পর্ক ছিলো শুধু ভালোবাসার, বরং এক সৃজনশীল জীবনের বীজ, যা তাদের ভবিষ্যতকে এক অমলিন চিত্রে রাঙিয়ে দেয়। আশিফ যখন কোথাও থাকেন, তখন যেন তার উপস্থিতি এবং কর্মই এক অদ্ভুত শক্তি হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন এক সশক্ত পথিক, যিনি সবার মাঝে উপস্থিত থাকতেন, সব জায়গায় তার অবদান দৃশ্যমান ছিলো। সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই তার পদচারণা ছিলো। তার কর্মের মধ্যে যে এক ধরনের অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে আছে, তা আমরা সকলেই উপলব্ধি করি। আশিফের জন্য কোনো কিছুই ছিলো অজানা বা অপরিচিত—তিনি সাহসী, তিনি ত্যাগী, এবং তিনি ছিলেন নিঃস্বার্থ এক সংস্কৃতি কর্মী। আশিফের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিলো তার নির্লোভ মনোভাব। তার কোন মানঅভিমান ছিলো না, কোন অহংকার ছিলো না। তার জীবন ছিলো এক সাধারণ মানুষের মতো, যেখানে কাজই ছিলো প্রধান। একসময় তিনি একটি অনুষ্ঠান চালাতেন, “সাহিত্যে নির্ভর সোমবারে আড্ডা”, যা চট্টগ্রামের সাহিত্যাঙ্গনে এক ধরনের ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এই আড্ডায় বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের পাশাপাশি উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী, শিল্পী এবং রাজনৈতিক নেতাদের কথা স্মরণ করা হতো। এই অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক ছিলেন তিনি নিজেই, এবং সবসময় অতি যত্নে ছবিও তুলতেন, যেন সেই স্মৃতিগুলো চিরকাল মনে রয়ে যায়। একসময় আমি নিজে নিয়মিত এই আড্ডায় অংশ নিতাম। প্রতিটি সোমবার আসলেই আমি যেন আশিফের সাহিত্য আড্ডায় অংশ নিতে পাগল হয়ে যেতাম।
আশিফের সাথে এই আড্ডাগুলো আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে ওঠেছিলো। সাহিত্য নিয়ে, সংস্কৃতি নিয়ে, সমাজ নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা যে ব্যক্তির মধ্যে কাজ করতে পারে, সেই আশিফের প্রতিটি কথা, প্রতিটি আড্ডা যেন আমাকে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। তিনি না থাকলে হয়তো আমি এসব কিছু বুঝতে পারতাম না। আমি তার অনুষ্ঠানগুলোকে এক প্রকার অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। তবে আজকাল সে অনুষ্ঠানটি আর আগের মতো হয় না, কিন্তু আশিফের এই সংস্কৃতি চর্চার প্রতি গভীর অনুরাগ এবং মনোভাব আজও অটুট রয়েছে। এখন আশিফের জীবনটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে, একসময় যে ছন্নছাড়া যুবক ছিলেন, আজ তিনি একজন পরিণত মানুষ, একজন পরিবারপ্রেমিক, একজন সংস্কৃতি কর্মী। তার জীবনে এসেছে একটি নতুন রূপ, এক নতুন প্রেরণা। আজ আশিফ আর একা নয়, তার পাশে রয়েছে তার জীবনসঙ্গী, যার সাথে একযোগে তিনি জীবনকে আরও সুন্দরভাবে সাজাচ্ছেন। তারা একে অপরের মননশীলতা, চিন্তা এবং স্বাধীনচেতার পথ একসাথে চলেছেন, তাদের সম্পর্ক আজ এক অটুট বন্ধনে রূপান্তরিত হয়েছে।
আশিফ ইকবাল শুধু একজন সংস্কৃতি কর্মী বা সাংবাদিকই নন, তিনি আমাদের জন্য এক নিঃস্বার্থ পথিক। তার জীবন, তার চিন্তা-ভাবনা, তার কর্ম—সবকিছুই আমাদের শেখায় যে, সৎ পথে চলতে হলে নিজের আদর্শে অবিচল থাকতে হবে। তিনি একটি অমুল্য দৃষ্টান্ত রেখে চলেছেন, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার পথচলা, তার জীবনযাত্রা, এবং তার সংস্কৃতি চর্চা কখনো ভুলে যাওয়ার মতো নয়। আশা করি, আমরা তার মতোই সমাজে অবদান রাখতে পারব এবং সংস্কৃতি, সাহিত্যের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা অব্যাহত রাখব।