বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সেবামূলক সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে যখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বৈষম্যের ছায়া পড়ে, তখন কোনো কোনো কর্মকর্তা ব্যতিক্রম হয়ে সত্যিকারের সেবা প্রদানে নিজেদের উৎসর্গ করেন। এমনই একজন প্রশাসক হলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় নির্বাচন কমিশন অফিসের নবনিযুক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে সরকারি সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক কাঠামো, এবং জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর একগুচ্ছ বাস্তবধর্মী আলোচনা হয়।প্রশাসনিক কাঠামো ও ডেপুটেশনের সমস্যা-
সরকারি সংস্থাগুলোতে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ ডেপুটেশনে (প্রত্যায়ন ভিত্তিক বদলি) এসে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এই ডেপুটেশন নীতির ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরীর মতে, একজন অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাকে যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে তিনি নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু ডেপুটেশনে আসা কর্মকর্তাদের অনেকেই নতুন পরিবেশ ও দায়িত্ব সম্পর্কে অল্প জানেন, ফলে তারা দায়সারা ভাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠানটি কাঙ্ক্ষিত সেবার মান দিতে ব্যর্থ হয়। তিনি আরও বলেন, “আমরা সরকারি নির্দেশনার বাইরে যেতে পারি না। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সরকারি নীতিমালার ভিত্তিতেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবে সেই নীতিমালা যদি প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে সেটি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।”
জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ ও ষড়যন্ত্র- জাতীয় পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড সংক্রান্ত কার্যক্রম বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু বিগত সময়গুলোতে এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ সার্ভার ও ডাটাবেজ অন্য কোনো সংস্থার কাছে হস্তান্তর হলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে— এমনটাই মনে করেন মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, “জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থাপনা নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকার কারণেই এটি এতটা সুরক্ষিত রয়েছে। অতীতে একবার এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কিন্তু পরে সেটি বাতিল করা হয়। এখন আবার এটি রেজিস্ট্রার জেনারেলের অধীনে নেওয়ার একটি ষড়যন্ত্র চলছে।” তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, “রেজিস্ট্রার জেনারেলের অধীনে থাকা জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থার অবস্থাই দেখুন। একজন মানুষের একাধিক জন্মসনদ পাওয়া যাচ্ছে। তারা যদি জন্মনিবন্ধনের মতো একটি সাধারণ ডাটাবেস সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারে, তাহলে কীভাবে জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণ করবে?” জাতীয় পরিচয়পত্র: স্বাধীন- বাংলাদেশের বড় অর্জন-তিনি আরও বলেন, “জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থা স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অর্জনগুলোর একটি। বিশেষ করে ১/১১-এর সময় সেনাবাহিনী এটি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই প্রকল্পটি এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে একটি রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়।”
নির্বাচন কমিশন এখনো এই ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার মধ্যে পরিচালিত করছে। কিন্তু অন্য সংস্থার হাতে গেলে এটি নানা অনিয়ম ও জটিলতার মধ্যে পড়তে পারে।প্রবাসীদের আইডি কার্ড সমস্যা ও সমাধানের পথ- বর্তমানে প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে। বিশেষ করে অনেকের পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে আইডি কার্ডের তথ্যের গরমিল থাকার কারণে তারা বিদেশে নানা সমস্যায় পড়ছেন। এই বিষয়ে আলোচনায় মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী দুইটি বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেন—পাসপোর্ট অনুযায়ী আইডি কার্ড ইস্যু করা – প্রবাসীদের জন্য আপাতত পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী আইডি কার্ড ইস্যু করা যেতে পারে। এতে করে তারা বিদেশে ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা থেকে রক্ষা পাবেন। পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে তথ্য সংশোধনের সুযোগ রাখা যেতে পারে।
প্রবাসীদের জন্য পাসপোর্ট-নির্ভর আইডি কার্ড ব্যবস্থা চালু করা – তিনি আরও বলেন, “যদি পাসপোর্টকে একমাত্র পরিচয়পত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রবাসীদের জন্য পাসপোর্টের ভিত্তিতেই সব সেবা নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্রবাসীদের জন্য এমআরপি (মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট) পাসপোর্ট ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজনীয়তা কমানো যেতে পারে।”একজন মননশীল প্রশাসকের দৃষ্টিভঙ্গি- সাক্ষাতের শেষ পর্যায়ে আমি নবনিযুক্ত বিভাগীয় নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরীকে আমার লেখা বই ‘সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কথা’ উপহার হিসেবে প্রদান করি। তিনি বইটি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং বলেন, “এই সময়োপযোগী বইটি সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছে। এ ধরনের গবেষণাধর্মী লেখা আমাদের দেশ ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।” এই সাক্ষাতে তাঁর কথাবার্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝা যায়, তিনি শুধুমাত্র প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নন, বরং একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, দায়িত্বশীল এবং সেবাধর্মী ব্যক্তিত্ব। জাতীয় পরিচয়পত্রের নিরাপত্তা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা, এবং প্রবাসীদের সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা নিঃসন্দেহে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কার্যকর হয়ে উঠবে। মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরীর মতো স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ও উন্নয়নমূলক চিন্তার অধিকারী কর্মকর্তারা যদি দায়িত্বে থাকেন, তাহলে প্রশাসনিক জটিলতাগুলো কমে আসবে এবং সাধারণ জনগণ আরও উন্নত সেবা পাবে। তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিভাগীয় নির্বাচন কমিশন নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাবে, এই আশাই করি।