নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, ধীরে ধীরে তাকে নারীতে পরিণত করা হয়—সেই যে সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছিলেন, তার কথার সত্যতা আমরা যুগে যুগে অনুভব করে চলেছি। পুরুষ গৌরব বোধ করে তার পুরুষত্বে, মনে করে সে শক্তিমান, সে শাসক, সে প্রভু। অথচ একটি অন্ধ, বিকলাঙ্গ, নির্বোধ পুরুষও সমাজের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠতম নারীটির ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে পারে, তাকে অসহায় করে তুলতে পারে। এই নির্মম সত্যকে আমরা প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করি, নারীর প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে, প্রতিটি আর্তনাদে।
বিশ্বের নানা প্রান্তে নারী স্বাধীনতার কথা বলা হলেও, বাস্তবতার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ধর্ম, সংস্কৃতি, সমাজ—সব মিলিয়ে নারীকে এমন এক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করা হয়েছে, যেখানে তার অস্তিত্ব প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ইহুদিরা ভোরবেলা প্রার্থনায় বলে, “হে ঈশ্বর, আমাকে নারী করো না,” আর নারীরা বলে, “হে ঈশ্বর, তুমি যেমন আমাকে সৃষ্টি করেছ, আমি তাতেই সন্তুষ্ট।” এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে নারী হওয়া যেন একরকম শাস্তি, যা পুরুষদের হাত থেকে অল্প কিছু নারীই এড়িয়ে যেতে পারে।
গত ৮ ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়েছে, যদিও আমাদের দেশে তা কেবল কথার ভারে সীমাবদ্ধ থেকেছে। নারীর অবস্থার পরিবর্তন দূরে থাক, অনেকেই এখনো জানেই না কেন এই দিনটি পালিত হয়। নারী অধিকার, স্বাধীনতা, আত্মসম্মান—সবকিছুই যেন একটা অলীক স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ বিশ্বে এমন অনেক নারী আছেন, যারা সেই বেড়াজাল ভেঙে সামনে এগিয়েছেন। আর্জেন্টিনার প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ, পাকিস্তানের প্রথম মুসলিম নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো কিংবা আমাদের দেশের সাবেক দুই নারী প্রধানমন্ত্রী—তারা সকলেই প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথ কেটেছেন। কিন্তু আমাদের লজ্জা হয়, যখন দেখি, নারীর সেই সংগ্রামকেও একসময় কারাগারের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়।
আধুনিক সমাজে নারীর আড়ি-
বাংলাদেশে নারী এখনো নারীবাদী হয়ে উঠতে পারেনি। অনেকেই নারী অধিকার সম্পর্কে জানে না, আবার অনেক পুরুষ চায় না যে নারী এসব বুঝুক। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে বোঝাতে চায়, সে দুর্বল, তার ক্ষমতা সীমিত। অথচ সেই নারীই জন্ম দেয় পুরুষকে, লালন করে, গড়ে তোলে। তবু সে নিগৃহীত হয়, প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।
একজন স্বামী তার স্ত্রীকে সামান্য কারণে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে, প্রেমিক তার প্রেয়সীকে ফেলে রেখে চলে যায়, বাবা-মা যৌতুকের দায়ে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেয়, আর সমাজ নির্লজ্জের মতো চেয়ে দেখে। আমাদের দেশে এমন একটি দিন নেই, যেদিন কোনও নারী নির্যাতিত হয় না, বঞ্চিত হয় না। নারীকে শুধুমাত্র ভোগের বস্তু হিসেবে দেখা হয়, বাজারের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পুরুষের বিনোদনের জন্য নারীকে কখনো সিনেমার পর্দায়, কখনো বিজ্ঞাপনের ফাঁদে, কখনো আবার অপরাধ জগতের গভীর অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়। সরল, সোজা অজপাড়াগাঁয়ের মেয়ে নিকিতা যখন ঢাকায় আসে, সে স্বপ্ন দেখে নতুন জীবনের। কিন্তু কিছু কামুক পুরুষের লালসার ফাঁদে পড়ে একসময় সে পরিণত হয় ‘ইয়াবা সুন্দরী’তে। তার জীবন, তার যৌবন, তার সমস্ত স্বপ্ন অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যায়। আর এই সমাজ অবলীলায় তার দিকে আঙুল তোলে, কিন্তু যারা তাকে সেই অন্ধকারে টেনে নিয়ে গেছে, তাদের নামে কোনও নালিশ ওঠে না। একটা সময় তিন্নির মতো মেয়েদের খবর হয় পত্রিকার পাতায়—বস্তাবন্দি লাশ হয়ে, অজ্ঞাত পরিচয়ে কাচপুর ব্রিজের নিচে ভেসে ওঠে। কিন্তু এই নারীদের মৃত্যুও যেন সমাজের বিবেক নাড়িয়ে দিতে পারে না। এভাবেই একজন নারী, যাকে সমাজ ‘সুন্দরী’ বলে চিহ্নিত করে, একসময় হয়ে ওঠে অনাদরের, অবহেলার, লাঞ্ছনার প্রতীক।
নারী কি শুধুই শরীর?
নারী মানেই কি রূপ? নারী মানেই কি দেহের ব্যবসা? সভ্য সমাজে এই প্রশ্নের উত্তর আমরা বারবার পাই না। আমরা দেখি, বিশ্বজুড়ে সুন্দরী প্রতিযোগিতা হয়, যেখানে নারীর সৌন্দর্যকে বিচার করা হয়, কিন্তু তার মেধা, তার আত্মমর্যাদা, তার চিন্তাশক্তি মূল্যহীন থেকে যায়। নারীর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যকে কখনো প্রকাশ হতে দেওয়া হয় না, বরং তাকে এমন এক চেহারায় তুলে ধরা হয়, যা শুধুমাত্র পুরুষের লালসা চরিতার্থ করতে পারে।
উন্নত বিশ্বে নারীদের পোশাক স্বাধীনতা আছে বলে মনে করা হয়, কিন্তু আসলেই কি তাই? সেই সমাজেও নারীরা নির্যাতিত হয়, ভিন্ন এক কাঠামোর মধ্যে বন্দী হয়ে থাকে। সেখানে হয়তো পর্দার বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু পুরুষতন্ত্র সেখানে নারীর
পোশাককেই দোষারোপ করে। মধ্যপ্রাচ্যে আবার নারীদের শরীরকে ঢেকে রাখার নামে তাদের স্বাধীনতাকে কুক্ষিগত করা হয়। সতীত্ব রক্ষার অজুহাতে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করা হয়।
একই পৃথিবীতে আবার এমন কিছু দেশ আছে, যেখানে ‘ফ্রি সেক্স’ বা ‘ওপেন সেক্স’ নামে নারীদেরকে একরকম পশুর মতো ব্যবহার করা হয়। যেন নারীর কোনও ইচ্ছা থাকতে পারে না, কোনও স্বপ্ন থাকতে পারে না, সে কেবলমাত্র ভোগের পাত্র।
নারীর মুক্তি কোথায়?
নারী যে অবহেলিত, নির্যাতিত, লাঞ্ছিত—সেটা বুঝতে পারার জন্য কোনও বিশেষ জ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্লেটো যখন দেবতাদের ধন্যবাদ দেন এই কারণে যে, তাকে নারী করা হয়নি, তখনই বোঝা যায়, নারীর অবস্থান কতটা নিচে নামিয়ে রাখা হয়েছে। পবিত্র কোরান বলে, পুরুষ নারীর কর্তা, কারণ আল্লাহ তাদের একে অপরের ওপরে বিশেষত্ব দান করেছেন। কিন্তু সেই বিশেষত্ব কি শোষণের জন্য?
হযরত মুহাম্মদ (স.) নারীদের সম্মানের উচ্চস্থানে বসিয়েছিলেন, অথচ তার শিক্ষার অপব্যাখ্যা করে পুরুষেরা নারীকে নিজেদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করে গেছে যুগ যুগ ধরে। তারা বিধান তৈরি করেছে, যেখানে পুরুষের সুবিধা একচেটিয়া। তারা নারীর ওপর এমন সব কল্পিত দোষ চাপিয়েছে, যা কখনোই খণ্ডন করা সম্ভব নয়।
সন্তজন ক্রাইসোসটম বলেছিলেন, “সমস্ত বর্বর পশুর মধ্যেও নারীর মতো ক্ষতিকর আর কিছু নেই।” অথচ, একজন নারীই পারে সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে, পারে নতুন জীবন সৃষ্টি করতে।
শেষ কথা-নারী যদি সত্যিই দুর্বল হতো, তাহলে সে এতকাল বেঁচে থাকতো না, সে এত প্রতিকূলতা জয় করে সামনে এগিয়ে আসতে পারতো না। নারী হলো প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, সে শুধু একজন মা, একজন বোন, একজন স্ত্রী নয়—সে একজন মানুষ। আমাদের শপথ নিতে হবে—নারীর সাথে আড়ি নয়, নারীরাও মানুষ। তাদের প্রতি অবিচার নয়, তাদের অধিকার দিতে হবে। আমাদের কণ্ঠ উচ্চারিত হোক—”নারীর সাথে আড়ি নয়, নারীরাও মানুষ।”
[5:48 AM, 3/9/2025] +880 1711-722247: গল্পে গল্পে জীবন কথাঃ
“নারীর সাথে আড়ি”
মো.কামাল উদ্দিনঃ
প্রথম অধ্যায়: জন্ম যন্ত্রণা
রূপসা জন্ম নেয় এক ঝড়বৃষ্টির রাতে। গাছের ডাল ভেঙে পড়ছিল, খড়ের ঘরের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির ধারা ভিতরে প্রবেশ করছিল। সে মুহূর্তে তার মা যন্ত্রণায় কাঁপছিলেন, যেন প্রকৃতিও তার কষ্টের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। দাইমা বলেছিল, “মেয়ে হইছে, কপাল খারাপ! ছেলের আশা কইরা কি হইলো?”
রূপসা যখন প্রথম চোখ খুলে দেখল এই পৃথিবী, তখনই যেন শোনে প্রথম অভিশাপ—সে মেয়ে হয়ে জন্মেছে! বাবা, যে তার জন্য ফসলের মাঠে শ্রম দিয়েছিল, সে মুখ ফিরিয়ে নিল। মা—যিনি জীবন দিয়ে
তাকে জন্ম দিলেন—তিনিও অপমানের ভারে চোখ নামিয়ে নিলেন। এই ছিল রূপসার জন্মের ইতিহাস।
দ্বিতীয় অধ্যায়: সমাজের আড়ি
রূপসা বড় হলো একটা দমবন্ধ পরিবেশে। সে যখন পাঁচ বছরে পা দিল, তখন থেকেই তাকে শেখানো হলো—“মেয়ে হয়ে বেশি হাসাহাসি করা ঠিক না, বেশি জোরে কথা বলা বেয়াদবি।”
সে যখন স্কুলে যেতে চাইলো, বাবা বলল, “মেয়েদের এত লেখাপড়া শিখে কী হবে? শেষমেশ তো অন্যের ঘরেই যাবে।”
তবুও মা লুকিয়ে স্কুলে পাঠাতেন, কিন্তু পথটা ছিল কাঁটার মতো কঠিন। স্কুলের পথ ধরে হাঁটতে গেলে ছেলেরা পেছন থেকে খোঁচা দিত, কটুক্তি করত। রূপসা বুঝত না, তার দোষ কী? শুধু মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছে বলেই?
তৃতীয় অধ্যায়: প্রেম ও প্রতারণা
বয়স বাড়তে লাগল, রূপসা এখন কিশোরী। চুলে বেণি করে স্কুলে গেলে পাশের গ্রামের ছেলেরা তাকে দেখে হেসে বলত, “রূপসার চুল যেন সাপের মতো লম্বা, চোখ যেন ডাগর ডাগর, মেয়েটা বড় সুন্দর!”
একদিন এক যুবক, নাম তার আরমান, তাকে বলল, “তোমার চোখে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, রূপসা! আমার জীবনটাও তোমার চুলের মতো শক্ত বাঁধনে বাঁধা পড়ুক।”
রূপসা প্রথমবারের মতো অনুভব করল প্রেম। কিন্তু সে জানত না, এই প্রেমও এক ধরনের আড়ি।
দিন যেতে লাগল, রূপসা আরমানের প্রতি গভীর বিশ্বাস রাখল। কিন্তু একদিন জানতে পারল, আরমান শুধু তাকে নয়, আরও অনেক মেয়েকেই একই কথা বলে। সমাজের চোখে সে এখন কলঙ্কিত!
চতুর্থ অধ্যায়: পণ্যের মতো নারী
বাবা আর সমাজের প্রবীণরা মিলে সিদ্ধান্ত নিল—রূপসার বিয়ে হবে। কোনো জিজ্ঞাসা করা হয়নি তাকে। আর্থিক সংকটের কারণে বাবা মোটা অঙ্কের যৌতুক গ্রহণ করল, আর রূপসা এক অচেনা ঘরে পাড়ি দিল।
স্বামী প্রথম দিন বলল, “তোমাকে আমি স্ত্রী হিসেবে এনেছি, কিন্তু নিজের মতো চলতে দিও না। আমি যা বলব, তাই শুনবে।”
রূপসার কল্পনায় স্বপ্নের সংসার ছিল, যেখানে সে ভালোবাসা পাবে, নিরাপত্তা পাবে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সে বুঝল, তার নতুন পরিচয় ‘বউ’ নয়, বরং ‘কাজের লোক’।
পঞ্চম অধ্যায়: প্রতিরোধ
বছর ঘুরে গেল, রূপসা এখন এক সন্তানের মা। তবুও অত্যাচার থামল না। এক রাতে স্বামী তাকে প্রচণ্ড মারধর করল। তার অপরাধ? সে প্রতিবাদ করেছিল!
সেই রাতেই রূপসা সিদ্ধান্ত নিল—আর নয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই সে সন্তানকে কোলে নিয়ে ঘর ছাড়ল। এই সমাজ, যা তার সাথে বারবার আড়ি দিয়েছিল, সেই সমাজের চোখে চোখ রেখে বলল, “নারীর সাথে আর আড়ি নয়, নারীরাও মানুষ।”
শেষ অধ্যায়: নতুন সূর্যোদয়
রূপসা শহরে এসে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। ছোট চাকরি করল, সন্তানের জন্য সংগ্রাম করল। সে প্রমাণ করল, নারী কোনো পুরুষের করুণা নয়, নারীও শক্তিশালী।
তার কন্যা, নীলা, একদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে বলল, “মা, আমাদের ক্লাসের বইয়ে পড়লাম—‘নারী হলো জাতির মেরুদণ্ড’। সত্যি কি তাই?”
রূপসা হাসল, চোখে জল এলো। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “তুমি একদিন সমাজের আড়ি ভেঙে পথচলা শিখবে, মা। নারীরা মানুষ, নারী আর কোনোদিন পণ্য হবে না।”
সমাপ্ত-এই উপন্যাস নারীদের শক্তির কথা বলে, সংগ্রামের কথা বলে। সমাজ যতবারই নারীর সাথে আড়ি দেবে, ততবারই রূপসার মতো কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে বলবে—‘নারীর সাথে আড়ি নয়, নারীরাও মানুষ।’