1. mail.bizindex@gmail.com : newsroom :
  2. info@www.bhorerawaj.com : দৈনিক ভোরের আওয়াজ :
রবিবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ০৮:১৩ পূর্বাহ্ন
সর্বশেষ :
শেরপুর সীমান্তে বন্য হাতির আক্রমণে আহত ১ পাসপোর্ট অধিদফতরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ: বরখাস্ত ও দুদকের মামলা! জীবনের শেষ প্রান্তে এক নিঃশব্দ যোদ্ধা: সাংবাদিক জামাল উদ্দিনকে হারিয়ে আমরা শোকস্তব্ধ নিরাপত্তাহীন ঈদ: সড়কে মৃত্যুর মিছিল ও অপরাধের উত্থান বাকলিয়া থানার পুলিশ কর্তৃক ডাবল মার্ডার কিলিং মিশনের দুই আসামি গ্রেফতার দাগনভূঞা থানার ওসি লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে  অভিযোগের পাহাড়! ভিক্ষুক সেফালী রানী দাস থেকে টাকা চাওয়ার বিষয়টি ভিত্তিহীন : এস আই রোকন পাটগ্রামের বাউরায় ঈদ পূর্ণমিলনী অনুষ্ঠিত  চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টে স্বর্ন, সিগারেট, মোবাইল ও বিপুল পরিমান অর্থসহ আটক ৪ চেরাগির আলোয় সাংবাদিক ও লেখকদের মিলনস্থল— ক্যাফে চেরাগি চক

“আছিয়া ও আফিয়ার গল্প: এক রাতের নৃশংসতা, এক জীবনের আর্তনাদ”

মোঃ কামাল উদ্দিন
  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৮ মার্চ, ২০২৫
  • ৩৬ বার পড়া হয়েছে

রাত গভীর। আঁধারের নিস্তব্ধতাকে ফুঁড়ে উঠে এক অসহায় মেয়ের ফিসফিসে কান্না। ঘরের ভেতর জ্বলছে মৃদু আলোর বাতি, তবু আলোয় কোনো উষ্ণতা নেই, নেই কোনো নিরাপত্তা। এই ঘর, যে ঘরকে একসময় নিজের আশ্রয় ভেবেছিল, এখন সেই ঘরই রক্তের দাগে, নির্যাতনের চিহ্নে, ভয় আর লজ্জায় নরকের রূপ নিয়েছে।
আফিয়া জানে, সে সব কিছু জানে। জানে সেই রাতে কী ঘটেছিল। শুধু সে রাতেই নয়, প্রতি রাতের সেই ভয়ংকর অভিশাপ। নিজের চোখে দেখেছে ছোট্ট আছিয়ার ভাগ্য কীভাবে কালো রাতের নির্মমতায় তছনছ হয়ে গেল। এখন প্রশ্ন, সে কি এই সত্য বলবে? না কি সেই নীরবতা বেছে নেবে যা সমাজ তাকে শিখিয়ে দিয়েছে?
রাতের অভিশাপ-
বিয়ের প্রথম রাতেই আফিয়া বুঝেছিল, সে আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো সুখী হবে না। স্বামীর কামনার দহন শেষ হওয়ার আগেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় সে। দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আসে আরও এক পুরুষ। গা কাঁপানো শীতল হাত বুলিয়ে দেয় তার শরীরে।
কিন্তু এই হাত তার স্বামীর নয়। অন্ধকারে টের পায় অন্য এক শরীরের গন্ধ, অন্য এক শ্বাসের উষ্ণতা। দম বন্ধ হয়ে আসে। তার গলা চেপে ধরে কেউ, ফিসফিসিয়ে বলে, “চুপ কর, নইলে মেরে ফেলবো।”
কিন্তু এই গলাটা চেনা! এ যে তার শ্বশুর!
শরীরটা একেবারে পাথর হয়ে যায়। পরক্ষণেই আরেকজন আসে। এবার তার দেবর। একেকজন একেকভাবে ছিঁড়ে খায় তার অস্তিত্ব। কান্না করতে চেয়েছিল, গলা খুলে চিৎকার করতে চেয়েছিল, কিন্তু ঠোঁটের উপর শক্ত একটা হাত চাপা দিয়ে রেখেছিল।
ভোর হলে কাউকে বলতে গিয়েছিল সে। স্বামী বলেছিল, “তোর মস্তিষ্ক ঠিক নেই।” শাশুড়ি বলেছিল, “ভূতের আছর হয়েছে তোকে।”
এভাবেই কেটে গেছে রাতের পর রাত, দিন গড়িয়েছে, কিন্তু সেই নরক থেকে মুক্তি মেলেনি। আছিয়া: এক নিষ্পাপ আত্মার আর্তনাদ- যখন বড় বোন আফিয়া শ্বশুরবাড়ির এই লজ্জা, এই অন্ধকার ঢেকে রাখার চেষ্টা করছিল, তখন ছোট বোন আছিয়া বেড়াতে গিয়েছিল দিদির বাড়ি। রাতে যখন সবকিছু নিস্তব্ধ, তখন আবার সেই অভিশাপ নেমে এলো। আফিয়ার স্বামী বাইরে গেল, আর ঘরে ঢুকলো সেই পিশাচ, তার শ্বশুর!
আফিয়া জানতো কী হতে যাচ্ছে। কিন্তু এবার সে একা নয়, পাশে ছোট বোন আছিয়া ঘুমিয়ে আছে। বোনকে বাঁচানোর জন্য সে পা দিয়ে ধাক্কা দিতে থাকে। কয়েকবার ধাক্কা দেওয়ার পর আছিয়া চমকে উঠে।
ঘরের লাইট জ্বালাতেই সামনে যা দেখল, তা বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার আপন দিদির শ্বশুর, একেবারে উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে!

“তুমি এখানে কেন? এভাবে কেন?”
শ্বশুর তাড়াহুড়ো করে পালিয়ে গেল। কিন্তু পরদিনই শুরু হলো ভয়ংকর প্রতিশোধ।
নরকযন্ত্রণা-
ছোট্ট আছিয়াকে একটা ঘরে আটকে রাখা হলো। মুখ, হাত-পা শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হলো। সবাইকে বলা হলো, “ও পাগল হয়ে গেছে।”
রাত গভীর হলে, নরকের সেই জানোয়ারগুলো আবার ফিরে এলো।
তারা জানতো, আছিয়া মুক্ত হলে সত্যি কথা বলে দেবে। তাই প্রথমে তার শরীরকে ভাঙতে চাইল, তারপর তার আত্মাকে মুছে ফেলতে।
ধ”র্ষ”কেরা একে একে প্রবেশ করল ঘরে। কিন্তু আছিয়ার বয়স ছিল কম। তার শরীর সইতে পারছিল না সেই বর্বরতা। তাই ছুরি বা ধারালো কাঠির মতো কিছু দিয়ে কেটে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করা হলো!
কিন্তু এটাই যথেষ্ট ছিল না। তারা ধাপে ধাপে শরীরের সমস্ত যন্ত্রণা তাকে উপহার দিল, একেকজন একেকভাবে। একপর্যায়ে মুখ চেপে ধরা হলো, যাতে সে চিৎকার না করতে পারে। অতিরিক্ত র”ক্ত”ক্ষ”রণের কারণে সে অজ্ঞান হয়ে গেল।
ওরা ভেবেছিল, সে মারা গেছে।
কিন্তু বিধাতা চেয়েছিলেন, আছিয়া বেঁচে থাকুক। সত্যের মুখোমুখি-
আছিয়া আজ হাসপাতালে শুয়ে আছে। এক নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে। ডাক্তার যখন তার ক্ষতবিক্ষত শরীর পরীক্ষা করছিলেন, তখন বারবার কেঁপে উঠছিলেন।
“এভাবে কেউ বেঁচে থাকে না… বেঁচে গেলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না।”
আছিয়া বেঁচে গেছে। কিন্তু তার ভিতরের যে শিশু ছিল, সেই নিষ্পাপ কিশোরীটি আর নেই। সে এক বিভীষিকার সাক্ষী, এক রক্তাক্ত ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি।

এদিকে আফিয়া নিজেও প্রতিদিন ধর্ষণের শিকার হয়েছে, প্রতিদিন নিজের মরে যাওয়ার অপেক্ষায় থেকেছে।
সাহসের শেষ ঠিকানা
আজ আফিয়া দাঁড়িয়েছে ক্যামেরার সামনে।
সে চুপ থাকতে পারতো, নিজেকে বাঁচাতে পারতো, কিন্তু আছিয়ার মুখটা ভেসে উঠল তার সামনে। তার ছোট বোন, যে সত্য বলার জন্য প্রাণ দিয়েও বেঁচে আছে, তাকে তো একা ফেলে রাখা যায় না।
“আমি মানুষ। আমারও ভালোভাবে বাঁচার অধিকার আছে!”
চিৎকার করে উঠে আফিয়া।
তারপর বলে যেতে থাকে সেই রাত্রের কথা, সেই ভয়ংকর অভিশাপের কথা। একে একে সব মুখোশ খুলে যেতে থাকে।
এই শহর, এই সমাজ, যারা ভেবেছিল মেয়েরা চুপ থাকবে, আজ তারা স্তব্ধ।
বিচার চাই, ন্যায়বিচার চাই!
সামনে হাজারো মানুষ, কারো চোখে অশ্রু, কেউ কান্না চেপে রেখেছে, কেউ দুঃখে মাথা নিচু করে ফেলেছে।
“ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই!”
গগনবিদারী আওয়াজ উঠে আসে জনতার ভিড় থেকে।
আজ আফিয়া আর একা নয়, তার পাশে দাঁড়িয়েছে একটি দেশ, একটি সমাজ, একটি বিবেক।
আছিয়া হয়তো সেই রাতে মরে বেঁচে গেছে। কিন্তু আজ আফিয়া বেঁচেও মরবে না, সে লড়বে।
এই লড়াই শুধু তার একার নয়, সমস্ত নির্যাতিতাদের লড়াই।
সমাপ্তি নয়, শুরু
এই গল্পের সমাপ্তি এখানেই নয়। এটি একটি যুদ্ধের সূচনা।
এই সমাজকে জাগতে হবে। এই অপরাধীরা কেবল শাস্তি পেলেই যথেষ্ট নয়, এমন বর্বরতা যেন আর কোনো মেয়ের ভাগ্যে না আসে, তার জন্য সবাইকে একসাথে দাঁড়াতে হবে।
এ সমাজ কি জেগে উঠবে? নাকি আরেকটি আছিয়ার কান্না রাত্রির আঁধারে হারিয়ে যাবে? এ প্রশ্ন আমাদের সবার।
আছিয়ার মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? রাষ্ট্র, সমাজ, নাকি আমরাই?
আছিয়া আজ নেই। তার ক্ষতবিক্ষত দেহ, তার নির্বাক চোখের ভাষা, তার শ্বাসরুদ্ধকর আর্তনাদ—সবকিছু মিশে গেছে সময়ের অতল গহ্বরে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে: এই মৃত্যুর দায় কার?
প্রথমেই কি আমরা বলব ধর্ষকরা দায়ী? হ্যাঁ, তারা তো দায়ী বটেই। কিন্তু এই সমাজ, এই রাষ্ট্র কি দায় এড়াতে পারে?
যে রাষ্ট্র ধর্ষকের পরিচয় আড়াল করে রাখে, অথচ ভিকটিমের মুখ মিডিয়ায় প্রকাশ পেতে দেয়, সে রাষ্ট্র কি শুধু দর্শক?
যে সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেয়ে ভিকটিমের পোশাক, চলাফেরা নিয়ে কথা বলে, সে সমাজ কি নির্দোষ?
যে বিচারব্যবস্থা বছরের পর বছর টেনে এনে ধর্ষকদের পার পাওয়ার সুযোগ করে দেয়, সে বিচারব্যবস্থা কি দায়মুক্ত?
আছিয়ার মৃত্যুর জন্য দায়ী আমরা সবাই—এই সমাজ, এই রাষ্ট্র, এই বিচারব্যবস্থা।
অতিউৎসাহী সাংবাদিকতা: আছিয়ার দ্বিতীয় মৃত্যু- ধর্ষিতার পরিচয় গোপন রাখার কথা ছিল।
তার ছবি প্রকাশ করার কথা ছিল না।
তার যন্ত্রণা নিয়ে সংবেদনশীল হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু কিছু অনভিজ্ঞ, অতিউৎসাহী সাংবাদিক ঠিক উল্টোটা করল। তারা আছিয়াকে মিডিয়ায় এমনভাবে উপস্থাপন করল, যেন সে কেবলই একটি ‘খবর’—একটি ‘হেডলাইন’, একটি ‘ব্রেকিং নিউজ’।
আছিয়াকে যারা শেষ করে দিল, সেই ধর্ষকদের পরিচয় কোথায়?
তাদের ছবি কি প্রকাশিত হয়েছে?
তাদের পরিবার, অতীত ইতিহাস কি খোঁজা হয়েছে?
তাদের শিক্ষাদীক্ষা, রাজনৈতিক সংশ্রব কি সামনে এসেছে?
না, এসব হয়নি। যা হয়েছে তা হলো আছিয়ার ব্যক্তিগত জীবনকে আরও ধ্বংস করা। মিডিয়ায় বারবার আছিয়ার দুঃখগাথা তুলে ধরা হলো, কিন্তু তার যন্ত্রণার মূল হোতাদের নিয়ে বিশদ কিছু লেখা হলো না। সমাজে তারা ঠিক আগের মতোই রয়ে গেল, তাদের মুখোশ টিকে রইল। আছিয়া বেঁচে থাকলেও হয়তো বাঁচতে পারত না—এই মিডিয়া কাভারেজই তাকে দ্বিতীয়বার হত্যা করত।
একতরফা ন্যায়বিচার নয়, প্রকৃত সুবিচার চাই- আমরা যখন কোনো ভিকটিমের গল্প বলি, তখন আমাদের দায়িত্ব তাকে সুরক্ষা দেওয়া, তাকে সম্মান দেওয়া।
আমাদের আসল লড়াই ধর্ষকের বিরুদ্ধে, ধর্ষকের পরিচয় প্রকাশ করা, তাকে সমাজচ্যুত করা, তার অপরাধের নির্মম বাস্তবতা সামনে আনা।
কিন্তু আমরা উল্টোটা করছি।
আমরা ধর্ষককে আড়াল করে রাখছি, আর ভিকটিমের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় জনসমক্ষে এনে তাকে আরও অপমানিত করছি।
আছিয়া চলে গেছে। কিন্তু পরবর্তী আছিয়াদের জন্য আমরা কী করতে পারি?
আমরা কি আবারও শুধু হাহাকার করব? না কি এই অনিয়ম, এই ভুলগুলো শুধরে নিয়ে সত্যিকারের সুবিচারের জন্য লড়ব?
আছিয়া আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যেন বৃথা না যায়। আমাদের প্রতিবাদ, আমাদের কলম, আমাদের সাংবাদিকতা যেন সত্যিকারের অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করে।
আমরা কি সেই সাহস দেখাব? নাকি আবারও নতুন কোনো আছিয়ার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকব?

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১  
© সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত
প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট