রাত যত গভীর হয়, ততই শহরের আলোগুলো ঝলমল করে ওঠে। শপিং মলগুলোয় ভিড় কমে এলেও নতুন জামা আর রঙিন জুতোর ঝলকানি তখনো টিমটিম করে জ্বলছে। দোকানের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা ছোট্ট শিশু—নোংরা, ছেঁড়া জামা পরা, চোখে বিস্ময় আর আকাঙ্ক্ষার ছায়া। তারা জানে, এই আলো, এই সাজগোজ তাদের জন্য নয়, তবুও দাঁড়িয়ে থাকে… শুধু দেখতে।
পাশেই বসে আছেন আমেনা বেগম। বয়স ষাটের কাছাকাছি। একটা সময় তারও সংসার ছিল, স্বামী-সন্তান ছিল। এখন কেউ নেই। ভিক্ষাবৃত্তিই তার একমাত্র অবলম্বন। ঈদের চাঁদ উঠেছে, কিন্তু তার চাঁদ দেখার মতো আনন্দ নেই। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে ঈদের জামা কিনতে যেতেন, সেমাই-পায়েস খেতেন। এখন ঈদের দিনেও হয়তো একমুঠো ভাত জুটবে কি না, সন্দেহ।
শহরের আরেক কোণে সোহেল দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধারে। বয়স বারো-তেরো। তার বাবার কোনো খোঁজ নেই, মা একটা বাসায় কাজ করেন। ঈদের আগে বাসার কাজ বেড়ে যায়, আর সেই বাড়ির বাচ্চার নতুন জামা কিনতে দেখে সোহেলের মন খারাপ হয়ে যায়। সেও একটা নতুন জামা চাইতো, কিন্তু সে চাওয়া বিলাসিতা। মায়ের মজুরিতে সংসার চলে না, নতুন জামা তো দূরের কথা!
সন্ধ্যার দিকে এক রিকশাওয়ালা এসে বসেন ফুটপাতে। সারাদিন যাত্রী টানার পর হাত-পা ব্যথা হয়ে গেছে। ঈদের আগের রাত, সবাই বাড়ি ফিরছে, কিন্তু তার যাওয়ার জায়গা নেই। স্ত্রী-সন্তান গ্রামে থাকে, টাকা পাঠিয়েছেন, কিন্তু নিজের জন্য কিছু রাখা হয়নি। নতুন লুঙ্গি কেনার কথা ছিল, হয়নি। শুধু ভরসা এক কাপ চা আর পুরোনো পাঞ্জাবি, যা তিনি ঈদের দিন পরবেন।
শহরের একপ্রান্তে বিলাসী জীবন, অন্যপ্রান্তে ঈদের আনন্দহীন মানুষের ভিড়। দোকানে দোকানে ঈদের সেল, খাবারের সুগন্ধ বাতাসে ভাসে, কিন্তু আমেনা বেগম, সোহেল, আর রিকশাওয়ালাদের মতো মানুষের কাছে ঈদ মানেই শুধুই আরেকটা দিনের নাম। নতুন জামা, ভালো খাবার, আনন্দ—সবকিছুই যেন তাদের কাছে আকাশের চাঁদ। তবুও, ঈদের সকালে আমেনা বেগম পরবেন তার সবচেয়ে ভালো শাড়িটা, সোহেল এক গ্লাস সরবত খেয়ে ভাববে, “এই-ই ঈদ,” আর রিকশাওয়ালা হাসিমুখে যাত্রী তুলবেন, কারণ ঈদের দিনটায় ভাড়া একটু বেশি পাওয়া যায়। এইভাবেই তাদের ঈদ কাটে—স্মৃতির, স্বপ্নের, না-পাওয়ার ঈদ।
সকাল থেকেই আকাশের রঙ যেন একটু উজ্জ্বল। গলির ভাঙা রাস্তায় জমে থাকা পানিতে ঈদের চাঁদের প্রতিফলনও আনন্দময় মনে হয়। অথচ ময়লার স্তুপের পাশে বসে থাকা ছেলেটির মুখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। নাম তার জসিম। বয়স হয়তো আট-নয় হবে। সে পথশিশু। তার কাছে ঈদ মানে ক্ষুধার্ত পেট, ঈদ মানে অন্যদের আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ দেখা। মসজিদের পাশ দিয়ে মানুষগুলো নতুন কাপড় পরে যাচ্ছে, হাতে সুগন্ধি আতর, কেউ কেউ খুশির খাম নিয়ে ছুটছে আত্মীয়ের বাড়ি। অথচ জসিমের ঈদ বলতে একটা শুকনো রুটি পাওয়া যাবে কি না, সেই ভাবনা।
কোনো এক সুহৃদয় ব্যক্তি যদি একটু সদয় হন, তবে হয়তো তার ঈদের সকালটা অন্য রকম হতে পারে। কিন্তু কে দেবে তাকে সেই ভালোবাসা? এ সমাজ কি জানে, ঈদের নতুন পোশাকের বদলে কেউ কেউ এক টুকরো রুটি খুঁজছে?
লুৎফা বেগমের চোখে জল। সকাল থেকেই কাজের বাড়িতে রান্নার ব্যস্ততা। বড়লোকের বাড়ির গৃহকর্মী তিনি, কিন্তু তার নিজের ঘরে আজ কিছু রান্না হয়নি। পাঁচ বছরের মেয়ে রীমা তার দিকে তাকিয়ে আছে। ‘আম্মু, আমার জন্য একটা জামা আনবে?’
লুৎফা জানে, সেই সামর্থ্য নেই। তার স্বামী বছরখানেক আগে তাকে ছেড়ে চলে গেছে, খোঁজ নেই কোনো। মেয়েটার প্রশ্নের উত্তরে সে শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অথচ পাশের বাসার ছোট মেয়েটির কত জামা, কত উপহার!
রাতের বেলা রীমা যখন কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন লুৎফার বুকের ভেতরটায় একটা শূন্যতা বাজে। ঈদ তো সবার জন্য সমান হওয়া উচিত ছিল, তাই না?
সত্তরোর্ধ্ব আমেনা খালার মুখে কোনো হাসি নেই। তার ছেলেরা সবাই বিদেশে, ঈদের দিনে কেউ তার খোঁজ নেয় না। বারান্দায় বসে তিনি শুধু রাস্তায় শিশুদের হৈচৈ দেখা ছাড়া আর কিছু করতে পারেন না। একসময় তার বাড়িতে ঈদের দিনে অতিথিদের ভিড় লেগে থাকত, ছেলে-মেয়েরা তাকে ঘিরে থাকত। এখন সে কেবল স্মৃতির সঙ্গে কথা বলে।
‘এটাই জীবন?’ একবার ফিসফিস করে বলেন তিনি, ঈদের দিনে।
পথশিশু, হতদরিদ্র নারী, একাকী বৃদ্ধা—তারা কি ঈদে একটু আনন্দ পাওয়ার যোগ্য নয়? এই সমাজ কি পারত না তাদের জন্য একটু ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিতে?
জসিমের হাতে যদি একটু মিষ্টি তুলে দেওয়া যেত, রীমার জন্য যদি কেউ একটা নতুন জামা এনে দিত, আমেনা খালার দরজায় যদি কেউ একটুখানি ভালোবাসা নিয়ে দাঁড়াত—তাহলে হয়তো ঈদ সত্যিকারের ঈদ হতো, সবার জন্য