চট্টগ্রামের আকাশ আজ কিছুটা ভারী, বাতাসে যেন এক নিস্তব্ধ হাহাকার। আর সে হাহাকারের কারণ—আমাদের প্রিয় সহযোদ্ধা, সাংবাদিক জামাল উদ্দিন আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি ছিলেন এক সংগ্রামী কলম সৈনিক, এক সজ্জন ও নির্লোভ মানুষ, যিনি নিভৃতে লিখে গেছেন, লড়াই করে গেছেন, কিন্তু নিজের কষ্ট, ক্লান্তি, ব্যর্থতা বা দুর্বলতা কখনও প্রকাশ করেননি। আমি তাকে সর্বশেষ দেখেছিলাম কোতোয়ালি থানার ওসি (অপারেশন) রুবেল সাহেবের কক্ষে। হাতে ছিল তার প্রতিষ্ঠিত দৈনিক চট্টগ্রাম পাতা পত্রিকার সম্পাদকীয় কার্ড। যখন সেটা বাড়িয়ে দিলেন, আমি কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “জামাল, কেমন আছো?”
তার চোখে-মুখে অবসাদ ছিল, ক্লান্তি ছিল—যে ক্লান্তি শুধু শরীরের নয়, বরং দীর্ঘ সংগ্রামের, অবহেলার, অসমাপ্ত স্বপ্নের ক্লান্তি। আমার মন বলেছিল, জামাল ভালো নেই। কিন্তু তিনি তখনও চুপচাপ ছিলেন, সবকিছু গোপন করে গেছেন। আমার সঙ্গে তার পরিচয় আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের। তখনও তিনি সাংবাদিকতায় আসেননি। তবে আমাদের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল সেদিনই। অনেক পরে তিনি যখন সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন এবং চট্টগ্রাম পাতা নামে একটি পত্রিকা চালু করেন, সেটির বাজার তৈরির লড়াইয়ে আমিও পাশে দাঁড়াই। পরে তিনি সেই পত্রিকাটি হস্তান্তর করেন আমার আরেক প্রিয় বন্ধু হুমায়ূনের কাছে। তখন সাংবাদিক নজরুলের অনুরোধে আমি টানা দুই বছর প্রতিদিন উপসম্পাদকীয় লিখেছি এই পত্রিকায়—রাষ্ট্র, সমাজ, ইতিহাস, সমসাময়িক রাজনীতি, এবং চট্টগ্রামের নানা সংকট নিয়ে। জানি না, কেউ কোনো স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় এত দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে এভাবে লিখেছেন কিনা।আজ সেই পত্রিকা, যার প্রতিটি পাতায় আমার কলমের স্পর্শ, জামাল উদ্দিনের জীবনের অধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে রইল। তিনি আজ নেই, তবে তার স্বপ্ন, তার সংগ্রাম এবং তার লড়াকু জীবনভঙ্গি আমাদের চেতনাকে বারবার নাড়া দিয়ে যাবে।
চিকিৎসা আরেকটু আগে পেলে হয়তো…
যখন থানায় দেখা হয়েছিল, তখন থেকেই মনে হচ্ছিল তার চিকিৎসা প্রয়োজন। শরীরটা যেন হাল ছেড়ে দিয়েছে। মুখে কিছু বলছিলেন না, কিন্তু চোখ বলছিল, “ভাই, খুব ক্লান্ত।”জানি না, শেষদিকে তিনি যথাযথ চিকিৎসা পেয়েছিলেন কিনা। হয়তো সময়ের অভাবে, অথবা নিজের কষ্ট কাউকে না জানানোর স্বভাবে, তিনি অবহেলিতই থেকে গেলেন। আজ তিনি চিরতরে চলে গেলেন—এই ব্যস্ত, স্বার্থপর পৃথিবী থেকে, যেখানে সংগ্রামী মানুষরা প্রায়ই অবহেলিত হন।শেষ বিদায়, নিঃশব্দ এক কান্না আজ বাদে জোহর, চট্টগ্রাম বেপারি পাড়া মসজিদের মাঠে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিল তার সহকর্মীরা, প্রতিবেশীরা, বন্ধুবান্ধব আর চেনা-অচেনা মানুষজন। তারপর তাকে দাফন করা হয় রিয়াজউদ্দিন বাজার সংলগ্ন চটাইন্যা গলি বাইশ মহল্লার কবরস্থানে।
জামালের বয়স বেশি ছিল না। আমাদের চেয়ে বয়সে ছোটই বলা চলে। কিন্তু জীবনের প্রতিটি দিনকে তিনি যেমন পরিশ্রমে ভরিয়ে তুলেছেন, তেমনি দুর্দিনেও মাথা নোয়াননি। তার জীবনের শেষ প্রান্তে কিছু না বলা কথা রয়ে গেল। হয়তো অনেক বেদনার, হয়তো অনেক স্বপ্ন অপূর্ণতার।
আমরা যারা তাকে চিনতাম, তারা জানি—তিনি ছিলেন বিনয়ী, সৎ, এবং আপাদমস্তক সাংবাদিক। শিরদাঁড়া সোজা রেখে চলা এক সাহসী মানুষ, যিনি কোনোদিন নিজেকে বড় করে তোলেননি, কিন্তু নিজের কাজ দিয়েই ছিলেন বড়। আজ তার অনুপস্থিতি শুধু চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজের জন্য নয়, বরং একটি লড়াকু ও সৎ জীবনের নিভে যাওয়া প্রদীপ—যার আলো আমাদের আরও কিছুদিন দিশা দিতে পারত।আমরা শুধু দোয়া করতে পারি—আল্লাহ জামাল উদ্দিন ভাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। তার কষ্ট, অবসাদ, সংগ্রাম যেন সেখানে প্রশান্তির পরিণতি পায়। আমিন।