হাছান মাহমুদের লন্ডনে আবির্ভাব: লুটপাটের টাকায় বিলাসিতার প্রতিচ্ছবি?”
ভোরের আওয়াজ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
৫ আগস্ট ২০২৪—এই দিনটি ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। শেখ হাসিনার অহংকার, স্বৈরাচারী নীতি ও দুর্নীতির পাহাড় তাকে ফেলে দিয়েছে রাজনৈতিক শূন্যতায়। বঙ্গবন্ধুর নামে রাজত্ব করলেও, তার নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা কেবল নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার খেলায় মত্ত ছিলেন। কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন গণমানুষের নেতা, আর শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছিলেন ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরা একনায়ক। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন সোনার বাংলার, যেখানে শোষণ থাকবে না, সাধারণ মানুষ ন্যায্য অধিকার পাবে। কিন্তু তার কন্যা সেই স্বপ্নকে হত্যা করে সৃষ্টি করেছেন এক দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বজনপোষণ ও দুঃশাসনের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। তিনি আওয়ামী লীগকে জনতার দল থেকে পরিণত করেছেন লুটেরাদের দলে, যেখানে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা নিগৃহীত, আর দুর্নীতিবাজরা বিলাসবহুল জীবনে মত্ত। তার আস্হাশীল সাধরণ মানুষ নয়, তার আস্হা বাজন ছিলেন হাসান মাহামুদের মতো রাজনৈতিক চরিত্রহীন তোষামোদকারিরা, যাঁরা প্রতিনিয়ত চাটুকারিতায় ব্যস্ত ছিল – তাও কিন্তু শেখ হাসিনা তাদের চাটিকারিদের মিথ্যা কথায় মজা নিতেন।
৫ আগস্ট ছিল শেখ হাসিনার স্বৈরাচারের অবসানের বার্তা। জনগণ আর ভীত নয়, তারা বুঝে গেছে বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতায় থাকার দিন শেষ। শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের বিশ্বাসের প্রতীক ছিলেন, কিন্তু শেখ হাসিনা সেই বিশ্বাসকে বারবার ভেঙে দিয়ে আজ একঘরে হয়ে পড়েছেন। ইতিহাসের এই নির্মম পরিহাস—পিতা জনগণের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন, আর কন্যা হয়ে ওঠেন জনগণের অভিশাপ।
৫ আগস্টের পর থেকেই সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের অবস্থান নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি আদৌ বাংলাদেশে আছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল রাজনৈতিক মহলে। গুঞ্জন ছিল, তিনি বিদেশে পালিয়ে গেছেন। এসব গুঞ্জনের মাঝেই হঠাৎ করে তিনি লন্ডনে ঈদের জামাতে প্রকাশ্যে এলেন।
ঈদের নামাজ শেষে মসজিদের বাইরে পরিচিতদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের মুহূর্তের কয়েকটি ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিশেষভাবে আলোচিত দুটি ছবিতে দেখা যায়—একটিতে তিনি যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ফারুকের সঙ্গে উষ্ণ কোলাকুলি করছেন, আরেকটিতে সাংবাদিক সৈয়দ আনাস পাশা, তার ছেলে, আইটিভির সাংবাদিক মাহাথির পাশার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই ছবিতে আরও দুজন কিশোরকে দেখা যায়, যাদের মধ্যে একজন সম্ভবত তার ছেলে ও অপরজন ভাতিজা বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই ছবি ভাইরাল হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন—যে মানুষটি এতদিন গোপনে ছিলেন, যে দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী মামলা-হামলার শিকার হয়ে নিপীড়িত, তিনি তাদের পাশে না দাঁড়িয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপনে ব্যস্ত কেন?
দেশকে ধ্বংস করে বিদেশে বিলাসবহুল জীবন-
রাজনীতির মাঠে সাধারণ নেতা-কর্মীরা যখন মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত, তখন হাছান মাহমুদের মতো নেতারা বিদেশে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের অভিযোগ, এ ধরনের নেতারাই আওয়ামী লীগের আজকের শোচনীয় অবস্থার জন্য দায়ী। তারা ক্ষমতায় থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে রেখেছেন, সাধারণ নেতাকর্মীদের স্বার্থের দিকে ফিরেও তাকাননি। তাদের দুর্নীতির কারণেই দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের পথে, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। অথচ তারা নিরাপদে বিদেশে বসে আরাম-আয়েশ করছেন।
একজন তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা মাঠে-ময়দানে নির্যাতনের শিকার, অথচ ওরা আমাদের রক্তের বিনিময়ে বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করছে। এই বিশ্বাসঘাতকদের প্রতিহত করতেই হবে।”
আরেকজন দলীয় কর্মী বলেন, “এই সব সুবিধাভোগী নেতারা আওয়ামী লীগের আদর্শ ধ্বংস করেছে। আজ দলকে যখন টিকিয়ে রাখার লড়াই করতে হচ্ছে, তখন তারা বহির্বিশ্বে সেকেন্ড হোম বানিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে আছে।”
তৃণমূলের দাবি: লুটপাটকারীদের প্রতিরোধ করুন-বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে—হাছান মাহমুদের মতো যেসব নেতা লুটপাটের মাধ্যমে সম্পদ গড়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিদেশে পালিয়ে যাওয়া এই সমস্ত দুর্নীতিবাজ নেতাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করার দাবি উঠেছে সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্য থেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের তৃণমূল যদি এখনই সচেতন না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দলের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। এ ধরনের আত্মস্বার্থপর নেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং তৃণমূলকেই সোচ্চার হতে হবে। একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা বলেন, “এই দুর্নীতিবাজ নেতারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে দলকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। যদি আমরা আজ মুখ না খুলি, তাহলে আগামী দিনে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব থাকবে না। এখনই সময়, এই সমস্ত লুটপাটকারী সুবিধাবাদীদের প্রতিরোধ করার।” বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন বড় প্রশ্ন—হাছান মাহমুদের মতো নেতা-কর্মীরা কি শুধুই বিদেশে আরাম-আয়েশ করবেন, নাকি দল ও দেশের প্রতি তাদের ন্যূনতম দায়বদ্ধতা আছে? জনগণ এবং তৃণমূল কর্মীরা এর জবাব চায়।
আমার এই লেখা লেখার সময় আওয়ামী লীগের এক ত্যাগী নেতা দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, “হাসান মাহমুদ একজন রাজনৈতিক চরিত্রহীন নেতা, যার কোনো লজ্জাবোধ নেই। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা যখন জীবন-জীবিকার সংকটে লড়ছে, সংগঠনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করছে, তখন তিনি লন্ডনের বিলাসবহুল পরিবেশে ঈদ উদযাপন করে হাসাহাসিতে মেতে উঠেছেন। এটি শুধু নির্মমতা নয়, এক নিষ্ঠুর ব্যঙ্গ।
তার এই রহস্যময় হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে এক অশুভ সংকেত—যেন তিনি উপহাস করছেন সেই ত্যাগী নেতা-কর্মীদের, যাঁরা দল ও দেশের জন্য নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। এমন আচরণ শুধু হতাশাই বাড়ায় না, আওয়ামী লীগের নীতি ও আদর্শকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশেষ করে চট্টগ্রামের মানুষ আর হাসান মাহমুদের মতো কলঙ্কিত মুখ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেখতে চায় না। দলকে যদি সত্যিকার অর্থে জনমানুষের সংগঠন হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে এ ধরনের সুবিধাবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক নেতাদের জায়গা পরিষ্কার করা জরুরি।”
#ভোরের আওয়াজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদক—